প্রথম নির্দলীয় সরকার কেমন নির্বাচন দিয়েছিল

আইকোনিক ফোকাস ডেস্কঃ নির্দলীয় সরকারব্যবস্থার অধীনে দেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। এটি ছিল পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর আগে আর কোনো স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচন বা গণভোট নির্দলীয় সরকারব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত হয়নি। সেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ছিলেন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। তাঁকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি করা হয়েছিল। অনেকের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সুষ্ঠু ছিল এই নির্বাচন, সরকার তথা প্রশাসন ছিল সবচেয়ে নিরপেক্ষ।

ওই নির্দলীয় সরকার গঠিত হয়েছিল স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ফসল হিসেবে। এরশাদের শাসনামলে দেশের সব প্রতিষ্ঠানে ভাঙন দেখা দেয়। বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, ব্যাংক, ব্যবসা-বাণিজ্য—সবক্ষেত্রে এরশাদ ও তাঁর দল জাতীয় পার্টির নগ্ন হস্তক্ষেপ প্রকট হতে থাকে। বাদ পড়েনি নির্বাচনব্যবস্থা। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দলীয় মাস্তান নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে তছনছ করে ফেলে। মানুষ নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনপ্রক্রিয়ার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। তবে অভিযোগ আছে, এরশাদ আমলের আগে ও স্বাধীনতার পরের বছরগুলোর নির্বাচনও সুষ্ঠু হয়নি।

আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ দেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৭ সালে প্রথমে গণভোট, ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৮১ সালের ৩০ মে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর পদ স্থায়ী করার জন্য ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন আওয়ামী লীগের ড. কামাল হোসেন। অনেকের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এই দুই আমলের একটি গণভোট, দুটি সংসদ নির্বাচন এবং দুটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কোনোটিই অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। তারই ধারাবাহিকতায় খারাপ নির্বাচনের চূড়ান্ত রূপ বাংলাদেশের মানুষ দেখে এরশাদের শাসনামলে। দেশের মানুষ ‘মিডিয়া ক্যু’ শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়, যার মাধ্যমে নির্বাচনী ফলাফলকে বিকৃত করে প্রচার করা হয়।

মিথ্যার সঙ্গে বসবাস

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাবাহিনীর প্রধান লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বরে এরশাদ রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ নিজেকে বৈধ করার জন্য গণভোটের আয়োজন করেন এরশাদ। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, ৭২ দশমিক ১৪ শতাংশ ভোট পড়েছিল। প্রদত্ত ভোটের ৯৪ দশমিক ১৪ শতাংশ পেয়ে এরশাদ দেশের সাংবিধানিক প্রেসিডেন্ট হন। তবে দেশি ও বিদেশি পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মানুষ গণভোটে অংশ নিয়েছিলেন। লন্ডন থেকে প্রকাশিত টাইমস পত্রিকা ‘লার্নিং টু লিভ উইথ এ লাই’ শিরোনামে প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে এই গণভোটকে ‘ধোঁকা’ বলে আখ্যায়িত করে। সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ২ শতাংশের বেশি মানুষ গণভোটে ভোট দেয়নি। (সেড; পৃ: ১০০)।

এরপর ১৯৮৬ সালের প্রথম দিকে প্রকাশ্য রাজনীতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ তখন থেকেই নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি করতে থাকে।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদফাইল ছবি

এরশাদের শাসনামলে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৬ সালের ৭ মে। এটি ছিল তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ ও দলটির জোটভুক্ত অন্যান্য দল এবং জামায়াতে ইসলামী অংশ নেয়। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোট ও পাঁচদলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকে। এই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির পেশিশক্তি দেশজুড়ে ভোটারদের ভয়ভীতি দেখায় ও ভোটকেন্দ্র দখল করে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা জাতীয় পার্টির গুন্ডাদের বিরত করেনি। (সেড; পৃ: ১০১)।

মানুষের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হতে থাকে যে এরশাদের অধীনে মানুষ নিজের ভোট নিজে দিতে পারবে না। ভোটের ফলাফল লুট হবে। অন্যদিকে সংসদ নির্বাচনে জোচ্চুরির পর নিজেকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর এরশাদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করেন। সব প্রধান বিরোধী দল এই নির্বাচন বর্জন করে এবং নির্বাচন প্রতিরোধেরও চেষ্টা করে। সরকার দাবি করে, ভোটারদের ৫৪ দশমিক ২৩ শতাংশ ভোট দেয় এবং প্রদত্ত ভোটের ৮৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ এরশাদের পক্ষে পড়ে। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোট পড়েছিল ১৫ শতাংশের কম। (সেড; পৃ: ১০১)।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর এরশাদবিরোধী আন্দোলন জোরদার হতে থাকে এবং ১৯৮৭ সালের শুরুর দিকে রাজনৈতিক জোটগুলো একত্রভাবে এরশাদের পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার হয়। লাগাতার জনসভা, ধর্মঘট, অবরোধ, হরতাল চলতে থাকে। ১৯৮৭ সালের ২৭ নভেম্বর দেশে জরুরি অবস্থা জারি এবং ৬ ডিসেম্বর সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াতসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে। জাতীয় পার্টি ছাড়াও ৭৬টি অখ্যাত রাজনৈতিক দলের জোট ‘সম্মিলিত বিরোধী দল’ এতে অংশ নেয়। এ ছাড়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (সিরাজ) ও ফ্রিডম পার্টিও এতে অংশ নেয়। ৩ মার্চ ভোটের দিন প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সারা দেশে হরতাল ডাকে। ওই দিন রাস্তাঘাটে মানুষ ও যানবাহন খুবই কম ছিল। ভোটকেন্দ্রগুলো ছিল প্রায় ভোটারশূন্য। ফলে জাল ভোট ও কাল্পনিক ভোট গণনার সাক্ষী হয় দেশের মানুষ। নির্বাচন কমিশন বলেছিল, ৫৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ ভোট পড়েছে, বিরোধী দলগুলো বলেছিল ১ শতাংশ ভোটারও ভোট দিতে যায়নি। (সেড; ১০২)।

Leave a Reply

Translate »