আইকোনিক ফোকাস ডেস্কঃ সারা দেশে সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজির ব্যাপক অভিযোগ পেয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি নানা অনিয়মের কারণে তিন শতাধিক হাইওয়ে পুলিশ সদস্যের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ওপরও গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারির খবর পাওয়া গেছে। এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী লোকজনের তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে হাইওয়েতে চাঁদাবাজির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। সম্প্রতি রুহুল আমিন নামের এক ট্রাকচালক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নওগাঁ থেকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বেগুন পৌঁছে দিতে পথে মোট চাঁদা দিতে হয়েছে দুই হাজার ৭৫০ টাকা। হাইওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার নাম ভাঙিয়ে এবং বিভিন্ন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে এসব চাঁদা দিতে হয়।
বাংলাদেশ পণ্য পরিবহন ফেডারেশনের খুলনা বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাই বলেন, ‘মেহেরপুর থেকে কারওয়ান বাজারে পণ্য পাঠাতে তিন টনের একটি ট্রাক থেকে ন্যূনতম তিন হাজার টাকা চাঁদাবাজি করা হয়। এতে ট্রাকভাড়া বেড়ে যায়, বাড়ে পণ্যের দাম।
গত কয়েক দিনে কারওয়ান বাজারে আরো ১৩ জন ট্রাকচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মালপত্র আনার সময় পথে চাঁদা দিতে হয়। এই হিসাবে, প্রতিদিন সবজির ট্রাক থেকেই লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি হয়।
এতে পুলিশের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের নেতা ও শ্রমিক নেতাদের অনেকে জড়িত বলে তাঁরা দাবি করেন।গত ৩ জুলাই সিলেট থেকে ঢাকাগামী পণ্যবাহী একটি কাভার্ড ভ্যান আটক করেন মহাসড়কে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। এক পর্যায়ে তারা অবৈধ পণ্য পরিবহনের অভিযোগ তুলে ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানার ওসিসহ ছয় পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়।
গতকাল শনিবার হাইওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি দেলোয়ার হোসেন মিঞা কালের কণ্ঠকে জানান, সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজির অনেক অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে গাজীপুর, চট্টগ্রামের পটিয়া এলাকাসহ আরো কয়েকটি সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজির অভিযোগ পেয়ে তদন্ত চলছে। হাইওয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত ১৪ মাসে হাইওয়ে পুলিশের কারো বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ পেলেই তাদের সতর্ক করা হয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, হাইওয়ে পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে ছয় দফা নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এ বিষয়ে সদর দপ্তরের এক চিঠিতে বলা হয়—হাইওয়ে পুলিশের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন মিডিয়ায় নেতিবাচক খবর পুলিশ সদর দপ্তরের নজরে এসেছে। তাই কার্যক্রমে গতিশীলতা এবং অধিক স্বচ্ছতা আনতে ছয় দফা নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে।
ওই নির্দেশনায় বলা হয়—হাইওয়ে পুলিশের কাছে বিদ্যমান বডিওর্ন ক্যামেরা ডিউটিকালে সার্বক্ষণিক চালু রাখতে হবে; দিনের বেলা হাইওয়েতে অযথা কোনো চেকপোস্ট বসানো যাবে না; দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যকে ইউনিফর্মে রাস্তার পাশে নিরাপদ স্থানে দাঁড়িয়ে কাগজপত্র চেক করতে হবে, কোনো অবস্থাতেই কাগজপত্র নিয়ে পুলিশ ভ্যান বা পিকআপে বসে চেক করা যাবে না অথবা গাড়ির কাগজপত্র দূরে নিয়ে যাওয়া যাবে না।
চিঠিতে আরো বলা হয়—হাইওয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মনিটরিং বাড়াতে হবে; প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে সাদা পোশাকে বের হয়ে ডিউটি তদারকি করতে হবে; যানবাহনের মাত্রাতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে স্পিডগান ব্যবহারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরে এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কোনো চাঁদাবাজকে হাতেনাতে ধরতে পারলেই তাৎক্ষণিক ‘ডিটেনশন’ দিয়ে কারাগারে পাঠানো হবে। নিয়মিত মামলা করে এ ঘটনায় মামলার তদন্ত প্রতিবেদন সাত দিনের মধ্যে আদালতে দাখিল করবে পুলিশ। আদালত এরপর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ওই মামলার রায় প্রদান করবেন।
বর্তমানে হাইওয়ে পুলিশের ৭৩টি থানার কার্যক্রম চালু রয়েছে। নতুন আরো ৬৮টি থানা চালুর প্রস্তাব গেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। বর্তমানে হাইওয়ে পুলিশের জনবল রয়েছে প্রায় তিন হাজার।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চাঁদাবাজি প্রতিরোধে বিশেষ অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, চাঁদাবাজচক্রের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। ৯৯৯-এ অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজি মামলার অনেক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।